গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে অনুমোদনহীন ক্ষতিকর যৌন উত্তেজক কোমল পানীয় সিরাপ। প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়া এসব সিরাপ সহজলভ্য হওয়ায় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ অল্প বয়সী তরুণ-তরুণীরা দ্রুত নেশায় জড়িয়ে পড়ছে—যা স্থানীয়ভাবে নতুন সামাজিক সংকট তৈরি করছে। বাজারজুড়ে অবাধ বিক্রি, নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ
সরেজমিনে উপজেলার বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাজার, পুরাতন বাজার, হাসপাতাল সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে—চায়ের দোকান, পানের দোকান, কনফেকশনারি ও মুদি দোকানে প্রকাশ্যেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে এসব উত্তেজক সিরাপ।
বোতল বা ক্যানে থাকা এসব পণ্যের অধিকাংশেই নেই কোনো অনুমোদনের তথ্য। বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের (বিএসটিআই) সিল নেই, নেই ড্রাগ লাইসেন্স নম্বরও।
বাজারে প্রচলিত কয়েকটি পণ্যের নাম— জিনসিন প্লাস, আঠারো প্লাস, ডাবল হর্স, পাওয়ারম্যান প্লাস, পাগলু ২ ফিলিংস, হান্ড্রেড পার্সেন্ট চার্জ, পাওয়ারআপ, লিডার ফিলিংস, সেভেন হর্স, কস্তরি হারবাল সিরাপ ও নাইট পাওয়ার।
তদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ সিরাপের গায়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা নেই। কোনো কোনো বোতলে নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া বা গাজীপুরের ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
“লিডার ফিলিংস” নামে একটি সিরাপে দাবি করা হয়েছে এটি ইউনানি হারবাল, যা শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে। আবার কোথাও লেখা “বিসিআইআর কর্তৃক পরীক্ষিত”—কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই। উঠতি বয়সিদের টার্গেট, বাড়ছে আসক্তি
ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন, এসব পণ্যের বড় ক্রেতা তরুণ-তরুণীরা।
এক মুদি দোকানি জানান,
“অনেকে লজ্জার কারণে স্লিপ পাঠিয়ে কিনে নেয়। দিনে কয়েকশ বোতল বিক্রি হয়।”এতে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
চিকিৎসকদের মতে, এসব সিরাপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান—
“এসব তথাকথিত হারবাল সিরাপ স্নায়ুকে সাময়িক উত্তেজিত করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি করে। উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগী বা দুর্বল শারীরিক অবস্থার কেউ সেবন করলে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে এসব সিরাপ উৎপাদন করা হচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করে বোতলজাত করা হয়, এরপর পাইকারদের মাধ্যমে জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—
প্রশাসনের চোখের সামনে প্রকাশ্যে এসব বিক্রি হলেও কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর-এর গাইবান্ধা জেলা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন—
“অনুমোদনহীন ও ভেজাল যৌন উত্তেজক সিরাপ উৎপাদন ও বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। খুব শিগগিরই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান জোরদার করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী এ ধরনের পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন—
“জনসাধারণকে সচেতন হতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের যৌন উত্তেজক পণ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। গোবিন্দগঞ্জে যৌন উত্তেজক সিরাপের নামে যা চলছে, তা শুধু অবৈধ ব্যবসা নয়—
এটি একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য হুমকি এবং উঠতি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া।