গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা জুড়ে অব্যাহত রয়েছে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের মহোৎসব। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্যেই এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে ভয়াবহ প্রভাব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসলি জমি, খাল ও জলাশয়ের পাশ থেকে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে নির্বিচারে মাটি কাটা হচ্ছে। দিন-রাত সমান তালে চলছে এসব কাজ। মাটি কেটে ট্রাক ও ডাম্পারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় সড়কগুলোতেও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে যেসব জমিতে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন হতো, এখন সেখানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক জায়গায় জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের জমির পাশ থেকেই মাটি কেটে নিচ্ছে। নিষেধ করলে উল্টো হুমকি দেয়। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো স্থায়ী সমাধান পাইনি।” তারা আরও জানান, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকার কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন চলতে থাকলে ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে, জলাবদ্ধতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় বন্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, যেখানে অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও নজরদারির অভাবে এসব অপরাধ দিন দিন বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান দিতে পারছে না। প্রভাবশালী চক্রের কারণে অভিযান শেষে আবারও একই কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।
এ অবস্থায় স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছেন, নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে গোবিন্দগঞ্জের পরিবেশ ও কৃষি সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের এই লাগামহীন কার্যক্রম এখনই বন্ধ না হলে, ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে পুরো উপজেলাবাসীকে—এমন আশঙ্কাই করছেন