• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন
Headline
গোবিন্দগঞ্জ থানায় দালালদের রাজত্ব; মামলা থেকে গ্রেপ্তার—সবকিছুতেই টাকার খেলা! পর্ব-০১ ঠাকুরগাঁও সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে ভারতীয় গরু, জানে না প্রশাসন “অভিযোগের পাহাড়, তবুও ধরাছোঁয়ার বাইরে সবুজ—কার শক্তিতে টিকে আছে বালু বাণিজ্য?” শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক লাবলু রহমান: ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের বিস্তর অভিযোগ দীর্ঘ শুনানি শেষে জামিনে মুক্ত যুবদল নেতা শাহীন আহমেদ রিজভী, টঙ্গীতে আনন্দের জোয়ার Chamet অ্যাপে ভিডিও কলের ফাঁদ: কোটি টাকার প্রতারণা, বিদেশে পাচার—গাইবান্ধার রনি সিন্ডিকেটের বিস্তৃত জাল গোবিন্দগঞ্জে আলোচিত ‘হ্যাকার’ শাকিল: সাইবার প্রতারণা থেকে ভাতা কেলেঙ্কারি ফুটানীবাজারে মুদি দোকানের আড়ালে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ, স্থানীয়দের উদ্বেগ ঔষধ প্রশাসনে পদোন্নতি বিতর্ক: অভিযোগের কেন্দ্রে দুই কর্মকর্তা (পর্ব-১) একশ’র বেশি হ্রদ যে উদ্যানে

Chamet অ্যাপে ভিডিও কলের ফাঁদ: কোটি টাকার প্রতারণা, বিদেশে পাচার—গাইবান্ধার রনি সিন্ডিকেটের বিস্তৃত জাল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২০৮ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

ডিজিটাল যুগে অনলাইন ডেটিং ও ভিডিও কল অ্যাপগুলো যেমন বিনোদন ও যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, তেমনি এগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভয়াবহ প্রতারণার অদৃশ্য সাম্রাজ্য। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে “Chamet” নামের একটি বহুল ব্যবহৃত ভিডিও কল অ্যাপকে ঘিরে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
এই চক্রের উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রনি নামের এক যুবকের নাম সামনে এসেছে। স্থানীয়ভাবে “উত্তরবঙ্গ এজেন্সি” নামে একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনার মাধ্যমে সে শত শত সাব-এজেন্ট বা ডায়মন্ড সেলারকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অ্যাপটিতে প্রবেশ করলেই বিভিন্ন নারী প্রোফাইল আকর্ষণীয় ও প্রলোভনমূলক ভঙ্গিতে উপস্থিত থাকে। এসব প্রোফাইল ব্যবহারকারীদের সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে। তবে এই ভিডিও কলে কথা বলার জন্য প্রয়োজন হয় “ডায়মন্ড” নামের ভার্চুয়াল মুদ্রা। কথোপকথনের মান, প্রোফাইলের জনপ্রিয়তা ও ভিজ্যুয়াল আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে প্রতি মিনিটে ১২০০ থেকে ৫০০০ ডায়মন্ড পর্যন্ত খরচ হয়।
এই ডায়মন্ড সরাসরি অ্যাপের ভেতর নয়, বরং নির্দিষ্ট এজেন্টদের মাধ্যমে কিনতে হয়—যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, রনির নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কে ২০ হাজার ডায়মন্ডের মূল্য নেওয়া হয় ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এই ডায়মন্ড বিক্রির জন্য তার অধীনে রয়েছে শত শত সাব-এজেন্ট, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করে।
তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—এই অ্যাপে “মাস্টার এজেন্ট” হতে হলে ডলারের মাধ্যমে প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডায়মন্ড কিনতে হয়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে এই বিনিয়োগের পরই একজন মাস্টার এজেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়। এরপর সেই ডায়মন্ড সাব-এজেন্টদের কাছে সরবরাহ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি চেইন মার্কেটিং বা মাল্টি-লেভেল সিস্টেমের মতো পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের মনস্তত্ত্বকে লক্ষ্য করে কাজ করে। প্রথমে কম খরচে আকৃষ্ট করা হলেও ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিও কলে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে ব্যবহারকারীদের আরও বেশি সময় ধরে যুক্ত রাখা হয়, ফলে তারা অজান্তেই বড় অংকের অর্থ খরচ করে ফেলেন।
ভুক্তভোগীদের একাধিক অভিযোগে জানা যায়, অনেকেই কয়েক হাজার থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত হারিয়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক সম্মান রক্ষার ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেন না, যা এই চক্রকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
অর্থ পাচারের বিষয়টিও উদ্বেগজনক। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডায়মন্ড বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ প্রথমে মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমে জমা হয়। এরপর বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে সেই অর্থ হুন্ডি বা অন্যান্য অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। এতে করে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্যও হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে রনির বিলাসী জীবনযাপন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অল্প সময়ের মধ্যে তার আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রতারণা ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করছে।
সচেতন মহল বলছে, প্রযুক্তির এই অপব্যবহার রোধে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে—বিশেষ করে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত হওয়া, অর্থ লেনদেন করা বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যতই আধুনিক হোক, সচেতনতা ও নিরাপত্তা ছাড়া তা সহজেই প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা