গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, থানাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত প্রক্রিয়া, এমনকি গ্রেপ্তার কার্যক্রম পর্যন্ত প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে প্রথমেই সাধারণ মানুষকে এক ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মুখোমুখি হতে হয়। এই চক্র থানার আশপাশে অবস্থান করে নিজেদের কখনো “সমাধানকারী”, কখনো “উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আছে” বা “থানার ভিতরের লোক” পরিচয়ে উপস্থাপন করে। এরপর শুরু হয় কথিত সমাধানের আশ্বাস, যেখানে মামলা দ্রুত নথিভুক্ত করা, এজাহারে নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়া, কিংবা প্রতিপক্ষকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার মতো প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন এক ধরনের অঘোষিত বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। টাকা ছাড়া কোনো অভিযোগ দ্রুত এগোয় না, আবার অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী কাজের গতি ও অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় এসে উল্টো আর্থিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি উঠেছে।
অভিযোগ আরও গুরুতর আকার নেয় তখন, যখন বলা হয় মামলা রেকর্ড হওয়া থেকে শুরু করে তদন্তের দিক নির্ধারণ এবং গ্রেপ্তার প্রক্রিয়াতেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা বা সাক্ষ্য-প্রমাণের চেয়ে “কার মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে” সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “থানায় গেলে মনে হয় আগে দালাল ধরতে হবে, তারপর মামলা হবে। না হলে কোনো কাজই এগোয় না।” আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, অভিযোগ দেওয়ার আগেই নাকি অর্থের অঙ্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও ভোগান্তির।
স্থানীয়দের দাবি, এই সিন্ডিকেট শুধু বহিরাগত দালালদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথাও শোনা যায়। তবে এসব অভিযোগ এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তাই স্থানীয়রা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, এই ধরনের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু একটি থানার ভাবমূর্তিই নয়, বরং পুরো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা দ্রুত একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
তাদের মতে, থানা জনগণের নিরাপত্তা ও সেবার কেন্দ্র, এটি কোনোভাবেই দালাল বা স্বার্থান্বেষী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে না।
পর্ব-২ (আসছে)
এই ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর্ব-২-এ উঠে আসবে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্য, কথিত সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে সক্রিয় দালালদের তালিকা, পাশাপাশি তাদের কথিত অপকর্ম ও প্রভাব বিস্তারের বিস্তারিত চিত্র।
(পরবর্তী পর্বে চলবে…)