গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় বয়স্ক ও বিধবা ভাতার নামে সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের কার্যক্রম নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার এই চক্র শুধুমাত্র সাধারণ মানুষকে টার্গেট করেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির আশ্রয়ে পরিচালিত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তালুককানুপুর ইউনিয়নের এক বাসিন্দা জানান, এই ইউনিয়নের তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৮০ ভাগ এই প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে, অর্থ সংগ্রহ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের প্রভাবশালী অবস্থানে উন্নীত করেছে; “কিছু নেতা আংগুল ফুলে কলাগাছ” হয়ে গেছেন এমন বর্ণনা স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, আনিছুজ্জামান বিদ্যুত তালুককানুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্ততি গ্রহণ করছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে চক্রের কার্যক্রমকে কেউ প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করার সাহস পান না। স্থানীয়দের দাবি, চক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে সাধারণ মানুষ প্রশাসন বা সরকারের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভয় পাচ্ছেন, আর অসহায় জনগণ নিরাপদ ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভাতা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায় করে আসছে। তারা ভুয়া সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় ব্যবহার করে বয়স্ক ও বিধবা সুবিধাভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং ভাতা অনুমোদনের আশ্বাস দিয়ে অর্থ গ্রহণ করত। অভিযোগ অনুসারে, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্যও সংগ্রহ করা হতো, যাতে ভুক্তভোগীরা সহজেই বিশ্বাস করে।
পুলিশ অভিযান চালিয়ে চক্রের কয়েকজন সদস্যকে আটক করেছে এবং মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক ও বিভিন্ন নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।(jugantor.com�)
আইনগতভাবে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ধারা ৪১৫ অনুযায়ী প্রতারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধারা ৪২০ অনুযায়ী প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ বা সম্পদ আত্মসাৎ করা হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। এছাড়া যদি প্রমাণিত হয় যে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতা চক্রকে সহায়তা করেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও দুর্নীতি সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে।
সামাজিক প্রভাবও গভীর। স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারী সেবা ও সমাজসেবা সংস্থা নিয়ে অনাস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। বহু অসহায় পরিবার ভাতা পাওয়ার আশায় অর্থ প্রদান করেও কোনো সুবিধা পাননি। অনেক বয়স্ক ও বিধবা নারী হতাশা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই ধরনের প্রতারণা রোধ করতে প্রশাসন, পুলিশ, সমাজসেবা বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা দালালকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবেদন করা উচিত কেবল উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় বা সরকারি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে। সন্দেহজনক বা অনৈতিক কার্যকলাপ দেখলে তা প্রশাসনকে জানাতে হবে। স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, গোবিন্দগঞ্জের বয়স্ক ও বিধবা ভাতা আত্মসাৎ চক্র কেবল অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়; এটি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মানুষের অসহায়ত্বের ওপর নির্মম আঘাত। চক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং চক্রের নেপথ্যের প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে থাকছে পর্ব-২।