নিজস্ব প্রতিবেদক | গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের বড় সাতাইল-বাতাইল মৌজার প্রায় ৫.৫ একর আয়তনের একটি পুকুর ও সংলগ্ন জমিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ কয়েক দশকের বিরোধ এখনও শেষ হয়নি। নিম্ন আদালত থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মালিকানা ও দখল সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ দাবি করলেও স্থানীয়ভাবে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, স্থানীয় সূত্র এবং অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্যমতে, জমিটি একসময় তৎকালীন জমিদার ইব্রাহিমের অধীনে ছিল। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী পত্তনমূলে জমির ভোগদখল ও মালিকানা অধিকার লাভ করেন মফিজ উদ্দিন আকন্দ ও সবেদ আলী আকন্দ।
বিরোধের সূত্রপাত ঘটে যখন একটি পক্ষ দাবি করে যে, জমিদার উক্ত পুকুরের ওপর জনসাধারণের ‘রাইট অব ইজমেন্ট’ বা ব্যবহারিক অধিকার প্রদান করেছিলেন। এ দাবির ভিত্তিতে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, আদালতে জনসাধারণের পক্ষে রাইট অব ইজমেন্ট প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আদালত মফিজ উদ্দিন আকন্দ ও সবেদ আলী আকন্দের পক্ষে রায় প্রদান করেন।
পরবর্তীতে মামলাটি বিভিন্ন আদালত অতিক্রম করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ২০১৮ সালে পাঁচ বিচারপতির একটি বেঞ্চ চূড়ান্তভাবে রায় প্রদান করে উক্ত সম্পত্তিতে বৈধ মালিকদের দখল ও ভোগদখলে কোনো বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
তবে অভিযোগ উঠেছে, আদালতের রায় সত্ত্বেও একটি মহল এখনও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি রানু মন্ডলের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি এ বিরোধকে নতুন করে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, অহেদুল ইসলাম মন্ডল, রফিক মন্ডল, ফুল মিয়া, ফরিদুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে এ বিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এর ফলে এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী দাবি করেন, আদালতের রায়ের পরও বিরোধকে জীবিত রাখার চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষ আরও দাবি করেছে, তাদের কাছে সংরক্ষিত কিছু অডিও রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্তে এ বিরোধের পেছনে স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের বিষয় উঠে এসেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সম্প্রতি পুকুরের মাটি কাটা ও দখলে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গোবিন্দগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, আদালতের রায় ও মালিকানার নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের দখল ও ভোগদখলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরও যদি একই বিষয় নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে তা উদ্বেগজনক। তারা প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত, আদালতের রায়ের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সকল পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
তবে এ প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
বড় সাতাইলের এ বিরোধ কেবল একটি পুকুর বা জমির মালিকানার প্রশ্ন নয়; এটি এখন আদালতের রায় বাস্তবায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।