• শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
ফুলবাড়ী ইউনিয়ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন পেতে আলোচনায় যারা ​ ​গোবিন্দগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির মহোৎসব: ভুয়া সমিতিতে জিম্মি জমি ক্রেতারা, মাসে পকেট কাটছে ৮১ লাখ টাকা! আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডিবি প্রধানকে বিশেষ সম্মাননা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ অবদান: গাইবান্ধার শ্রেষ্ঠ অফিসার মীর কায়েছ ২২ কোটি টাকার চাল আত্মসাৎ: দীর্ঘদিনেও গ্রেপ্তার হয়নি অভিযুক্তরা গোবিন্দগঞ্জে সমাজসেবা ও ইউনিয়ন পরিষদের নাম ভাঙিয়ে ‘ডিজিটাল সেবা কার্ড’—অভিনব প্রতারণার অভিযোগ ভালো মানুষের আড়ালে নারীকে ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ গোবিন্দগঞ্জের যুবলীগ নেতা শাহীন আকন্দকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড় গোবিন্দগঞ্জে জুয়ার আসরে অভিযানে ৯ জুয়ারি গ্রেফতার জুমার খুতবাহ প্রদান করবেন এমপি মোহাম্মদ শামীম কায়সার (লিংকন), হামিদপুর চিন্তিপাড়ায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মাঝে উৎসাহ গোবিন্দগঞ্জের বালুয়া তমিজউদ্দীন আহমাদিয়া মাদ্রাসায় নতুন নেতৃত্ব, সভাপতি রুহুল আমিন মন্ডল

২২ কোটি টাকার চাল আত্মসাৎ: দীর্ঘদিনেও গ্রেপ্তার হয়নি অভিযুক্তরা

Reporter Name / ৫৬৩ Time View
Update : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ধর্মীয় সভা, লিল্লাহ বোর্ডিং, শিশু সদন ও অনাথ আশ্রমে আগত মুসল্লিদের খাবারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ২২ কোটি টাকার সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে ২০২১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক মামলা দায়ের করে। দীর্ঘ চার বছর ১১ মাস ১২ দিন তদন্তের পর ২০২৫ সালে সাবেক দুই সংসদ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় ২ হাজার ২৫৩টি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, লিল্লাহ বোর্ডিং, শিশু সদন ও অনাথ আশ্রমে খাবারের জন্য মোট ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই চালের বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২২ কোটি ৩ লাখ ২১ হাজার ৫৯০ টাকা। অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে চাল পৌঁছানোর পরিবর্তে বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করে সরকারি খাদ্যশস্য উত্তোলন ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ঘটনাটি সামনে আসার পর দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চালায় দুদক। ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছিল। তবে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলার চিত্র বদলে যায়। চার দফা তদন্ত শেষে এজাহারভুক্ত ১০ জনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়। দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, তদন্তে তাঁদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে তদন্তে নতুন করে সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগপত্রে থাকা ১৬ জনের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আকতারা বেগম, সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাকিল আহম্মেদ, দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, তালুককানুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান, নাকাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল কাদের প্রধান, ফুলবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান মোল্লা, গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরীফ মোস্তফা জগলুল রশিদ, কামারদহ ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম এবং শিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী।

তদন্তে নতুন করে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয় গাইবান্ধা-৪ গোবিন্দগঞ্জ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, গাইবান্ধা-৩ পলাশবাড়ী-সাদুল্যাপুর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম, স্থানীয় খাদ্য ব্যবসায়ী ফয়জুল ইসলাম, সাবেক গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুল আহাদ, গোলাপবাগ খাদ্য গুদামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক, কামদিয়া খাদ্য গুদামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেমন্ত কুমার বর্মণ এবং মহিমাগঞ্জ খাদ্য গুদামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী আরজুমান নাহার।

তবে অভিযোগপত্রে নাম থাকা মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রত্যেক ব্যক্তির দায় নির্ধারিত হবে। একইভাবে এজাহার থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও তদন্তকারী সংস্থার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত অপরাধমুক্তির বিচারিক ঘোষণা নয়।

মামলার শুরুতে যে ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে সাবেক মহিমাগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান, তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, কামদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোশাহেদ হোসেন চৌধুরী, কাটাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, শাখাহার ইউপি চেয়ারম্যান তাহাজুল ইসলাম, রাজাহার ইউপি চেয়ারম্যান লতিফ সরকার, রাখালবুরুজ ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদত হোসেন, কোচাশহর ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন, শালমারা ইউপি চেয়ারম্যান আমির হোসেন এবং গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর গোলাপী বেগমকে পরবর্তী তদন্তে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়।

দুদকের তদন্তে মূল অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে সরকারি চাল উত্তোলনের নথি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাগজপত্র। অভিযোগ রয়েছে, যেসব ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা প্রকল্পের নামে চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন, সভা আয়োজন, চাল উত্তোলন এবং বিতরণ—প্রতিটি পর্যায়ের নথিপত্রে অসঙ্গতির অভিযোগ তদন্তে গুরুত্ব পায়।

বিশেষ করে এত বিপুল পরিমাণ চাল অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে উত্তোলন করা হলো এবং তা কোথায় গেল—এই প্রশ্নটি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন চাল প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল কি না, নাকি কাগজপত্রের মাধ্যমে উত্তোলন করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি খাদ্যশস্যের বরাদ্দ ও উত্তোলনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে। ২০২১ সালে মামলা হওয়ার পর অভিযোগপত্র দিতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ বছর। এর মধ্যে চার দফা তদন্ত হয়েছে। এজাহারভুক্ত কয়েকজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার নতুন করে সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এত দীর্ঘ তদন্তের পরও রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া অর্থ বা চাল উদ্ধারের বিষয়ে কী অগ্রগতি হয়েছে, সেটিও এখন জনমনে প্রশ্ন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এজাহারভুক্ত কয়েকজন উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি এবং তাঁদের গ্রেপ্তারও করা হয়নি বলে ওই সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে ২২ কোটি টাকার সরকারি সম্পদ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা হওয়ার পরও কেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর এখন মূল বিষয় হলো বিচারিক প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়। অভিযোগপত্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হবে কি না, সরকারি চাল আত্মসাতের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া অর্থ বা সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বিচারিক প্রক্রিয়ায়।

গোবিন্দগঞ্জের এই ঘটনা শুধু ২২ কোটি টাকার সরকারি চালের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি খাদ্যশস্যের ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব, প্রশাসনিক তদারকি, খাদ্যগুদামের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ। এত বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পদ কীভাবে বরাদ্দ হলো, কীভাবে উত্তোলন হলো, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে কতটুকু পৌঁছাল এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ উত্তর এখন প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলায় অভিযোগপত্র হয়েছে, কিন্তু বিচার শেষ হয়নি। ফলে গোবিন্দগঞ্জবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—২২ কোটি টাকার সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে প্রকৃত দায়ী কারা, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতে কত দ্রুত এগোবে এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া সম্পদ আদৌ উদ্ধার হবে কি না।

মামলার বিচারিক নিষ্পত্তিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে অভিযোগ কতটা সত্য এবং কার দায় কতটুকু। তবে সরকারি সম্পদ নিয়ে এমন বড় অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা